সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের দেশ ইউক্রেনে সামরিক অভিযান চালাচ্ছে অন্যতম বিশ্ব পরাশক্তি রাশিয়া। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সময় ভোরে এই অভিযান শুরু হয়। আজ শুক্রবার অভিযানের নবম দিন। বিগত আট দিনে দেশটির বিভিন্ন শহর দখলে নিয়েছে রুশ বাহিনী।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের দাবি, পূর্ব ইউক্রেন তথা লুহানস্ক ও ডোনেটস্কের নাগরিকের সুরক্ষার জন্যই এই সামরিক অভিযান। অন্যদিকে, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির অ্ভিযোগ, শুধু ক্ষেপণাস্ত্র বর্ষণ বা বিমানের শব্দ নয়, এই গর্জন আসলে সভ্যতা ধ্বংসের চেষ্টা, যার জন্য দায়ী থাকবে রাশিয়া।
রাশিয়া-ইউক্রেনের এই যুদ্ধকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে বড় সংঘাত বলে মনে করা হচ্ছে। ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার সামরিক অভিযান ঠেকাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বিপুল কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত তা সফল হয়নি।
এরই মধ্যে বহু মানুষ হতাহত হয়েছে ইউক্রেনে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বহু আবাসিক। গত আট দিনে দেশে ছেড়ে প্রতিবেশী বিভিন্ন রাষ্ট্রে আশ্রয় নিয়েছে ১০ লাখের বেশি মানুষ। যারা শরণার্থী হয়ে দেশ ছাড়ছেন তারা বাদেও এই যুদ্ধে এক কোটি ২০ লাখ অভ্যন্তরণীভাবে গৃহহীন হয়ে পড়বে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা।
ইউক্রেন যুদ্ধে পুতিনের ডান হাত হিসেবে কাজ করছেন তিনি হলেন রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রী সের্গেই শোইগু।
কে এই সের্গেই শোইগু?
শোইগুর নামের প্রথম অংশটি রুশ হলেও তিনি তুর্কি ভাষাভাষী দরিদ্র প্রদেশ তুবার একজন বৌদ্ধ। এই প্রদেশটি চীন সীমান্তের সঙ্গে। রাশিয়ার মধ্যে এ অঞ্চলটিতে খুন ও আত্মহত্যার হার সর্বোচ্চ।
তুবার অনেক বুদ্ধিজীবী তাকে মঙ্গোলীয় জেনারেল সুবেদেইর নতুন আবির্ভাব বলে মনে করে থাকেন। আট শতাব্দী আগে সুবেদেইর সেনাবাহিনী বর্তমান রাশিয়া ও ইউক্রেনের কাছে ব্যাপকভাবে পরাজিত হয়েছিল।
শোইগু সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার সময় মস্কোতে আসেন। ১৯৯০ দশকের শুরুর দিকে শোইগু জরুরি পরিস্থিতিবিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু করেন। মন্ত্রণালয়টিকে কার্যকর, সামরিক কাঠামোতে রূপ দেন। পুতিন প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগপর্যন্ত তিনি সব রাজনৈতিক তালিকায় শীর্ষে ছিলেন।
১৯৯০ থেকে ২০০০ সাল, এই দশ বছরে শোইগু প্রাকৃতিক দুর্যোগের স্থান পরিদর্শন, সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে বোমা হামলা এবং বেসামরিকদের সাথে সরাসরি কথা বলার জন্য ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেন, যা তাকে জাতীয় জনপ্রিয়তা অর্জনে সহায়তা করে।
২০১২ সালে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার আগপর্যন্ত শোইগুকে উদার গণতন্ত্রপন্থী হিসেবে মনে করা হতো। কিন্তু তার হাত ধরেই ক্রেমলিনের সব সাফল্য। ক্রিমিয়া দখল ও সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল–আসাদকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার সাফল্য তার হাত ধরেই আসে।
রাশিয়ান সামরিক বিশেষজ্ঞ দিমিত্রি গোরেনবার্গ বলেন, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকে রাশিয়ান সরকারের সিনিয়র পদে অধিষ্ঠিত থাকা হাতে গোনা কয়েকজনের মধ্যে শোইগু অন্যতম।
তিনি বলেন, “যদি খেয়াল করে দেখেন যে ১৯৯৯ সালে কে মন্ত্রীর ভূমিকায় ছিলেন এবং এখনও আছেন। তাহলে কেবল দুটি নামই পাবেন। একটি হল শোইগু, অন্যটি পুতিন।”
২০০৮ সালে রুশ-জর্জিয়ান যুদ্ধে একটি দ্রুত বিজয় সত্ত্বেও রাশিয়ার সামরিক বাহিনী তাদের যুদ্ধ ক্ষমতার পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। তখনই দেশটির সামরিক পরিকল্পনাকারীরা বুঝতে পেরেছিলেন যে তাদের যদি কখনও মার্কিন বা ন্যাটোর মতো আরও শক্তিশালী প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হতে হয় তাহলে তাদের আরও উন্নতির প্রয়োজন।
রাশিয়ান বংশোদ্ভূত সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা রেবেকা কফলার ফক্স নিউজকে বলেন, “জর্জিয়ার সঙ্গে যুদ্ধের সময় কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে, এটি রুশ বাহিনীর একটি ব্যর্থতা ছিল। কমান্ড এবং নিয়ন্ত্রণে রুশ সামরিক বাহিনীর মধ্যে বিপর্যয় লক্ষ্য করা যাচ্ছিল। তারা মোবাইল লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে পারেনি। তাই পুতিনের নির্দেশে, সামরিক বাহিনীকে অস্ত্র, প্রশিক্ষণ এবং মতবাদের দৃষ্টিকোণ থেকে রূপান্তর ঘটানো এবং আধুনিকীকরণ করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়।”
শিক্ষায় সামরিক কোনও যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও পুতিন ২০১২ সালে শোইগুকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী হিসেবে বেছে নেন। তাকে আনাতোলি সার্ডিউকভের পরিবর্তে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়। ৬৭ বছরের শোইগুর সাথে পুতিনের সম্পর্ক এতটাই ঘনিষ্ঠ যে, প্রায়ই পুতিনের সঙ্গে মাছ ধরতে ও শিকারে যেতে দেখা যায় শোইগুকে। তাকে পুতিনের সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবেও বিবেচনা করা হচ্ছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
আপনার মন্তব্য লিখুন